একই সঙ্গে মাঠ পর্যায়ের প্রায় সব নেতাই যতদ্রুত সম্ভব ২০ দলীয় জোট ভেঙে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টসহ সরকারবিরোধী সব দলের সঙ্গে মিলে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবিতে ‘যুগপৎ আন্দোলনে’ নামার ওপর জোর দিয়েছেন তারা। তাদের মতে, এর আগে অনেক ‘সফল আন্দোলন’ যুগপৎভাবে হয়েছে। রাজপথে কঠিন আন্দোলনের ক্ষেত্রে কে কী ‘ভূমিকা’ রাখছে, তা নিরীক্ষণের ভিত্তিতে নতুন সরকারবিরোধী ‘বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য’ হতে পারে।

প্রথম পর্বে গত ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে টানা তিন দিন এবং দ্বিতীয় পর্বে ২১ সেপ্টেম্বর থেকে টানা তিন দিনসহ মোট ছয় দিনের সিরিজ বৈঠকে বক্তব্যকালে বিএনপির মাঠ পর্যায়ের ২৬১ জন নেতা পৃথক বক্তব্যে এসব দাবি জানান। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সামনে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ পরিত্যাগসহ আট দফা প্রস্তাবনা তুলে ধরেন দলের মাঠ পর্যায়ের এই নেতারা। অন্য সাতটি প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে- নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায়ে ক্ষমতাসীন সরকার পতনে বিএনপির নেতৃত্বেই কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা; জামিনে মুক্ত দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে পুরোপুরি মুক্ত করা; জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে আর জোটবদ্ধ না হওয়া; দলের ‘কমিটি বাণিজ্য’ বন্ধ করে কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি গঠন; দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার পাশাপাশি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়া; কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো এবং অঙ্গসংগঠনের কমিটি গঠনে মূল দলের সঙ্গে সমন্বয় করা।

বিএনপির নীতিনির্ধারক সূত্র জানিয়েছে, মাঠ নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ এসব প্রস্তাব পর্যালোচনা করে দলের পরবর্তী কর্মকৌশল নির্ধারণ করতে চাইছে হাইকমান্ড। এ লক্ষ্যে আজ শনিবার দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা ও পর্যালোচনা করে রণকৌশল ও সিদ্ধান্ত নেবে দলটি। বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো পরে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরবেন তারা।

অবশ্য মাঠ নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়ন করা দলটির হাইকমান্ডের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্নেষক ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা। তারা বলছেন, বিএনপির মাঠ পর্যায়ের নেতাদের পক্ষে কোনো প্রস্তাব দেওয়া যত সহজ, তা বাস্তবে রূপ দেওয়া ততই কঠিন। বর্তমানে সাংগঠনিকভাবে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে বিএনপি। সার্বিকভাবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিও এখনও বিএনপির অনুকূলে নেই। তার পরও রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা চালানোর বিকল্প নেই।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সমকালকে বলেন, দলের কেন্দ্রীয় ও মাঠ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষ হয়েছে। এতে নেতা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সাংগঠনিক বিষয়ে নিজস্ব মতামত দিয়েছেন। মাঠ নেতাদের বক্তব্য দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনার পর কর্মকৌশল নির্ধারণ করা হবে। সময়মতো আমরা এসব বিষয় জানাব।

সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার সমকালকে বলেন, মাঠ পর্যায়ের নেতারা জামায়াতে ইসলামী ইস্যুসহ যেসব প্রস্তাব দিয়েছেন, সেগুলোর বাস্তবায়ন নির্ভর করছে বিএনপির সদিচ্ছার ওপর। নেতাদের উচিত ছিল, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দলকে এর মধ্যে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করে গড়ে তোলা। অবশ্য দলটির নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন আছে। এ পরিস্থিতিতে দলের মধ্যে মাঠ নেতাদের কঠিন প্রস্তাবগুলোর প্রতিফলন ঘটানো সহজ নয়। বিশেষ করে বর্তমান পরিস্থিতি যখন দলটির জন্য বিরূপ। সে বিবেচনায় এসব কঠিন ইস্যুতে সিদ্ধান্ত নেওয়া তাদের জন্য নিঃসন্দেহে কঠিন চ্যালেঞ্জ। তবে সাহস ও অতীতের ভুলভ্রান্তি থেকে শিক্ষা নিয়ে বিএনপি এগিয়ে গেলে দল ও জাতির জন্য মঙ্গলজনক হবে। কারণ সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল ছাড়া গণতন্ত্র শক্তিশালী রূপ পায় না।

বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ছয় দিনের সিরিজ বৈঠকে দলের ভাইস চেয়ারম্যান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, যুগ্ম মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদক, বিভিন্ন সম্পাদক, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা মিলে ৩৫০ জন নেতা অংশ নেন। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে এবং জাতীয় স্থায়ী কমিটির নেতারা বৈঠকে সরাসরি উপস্থিত থেকে সবার বক্তব্য শুনেছেন।

বৈঠকে অংশ নেওয়া বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় ও মাঠ পর্যায়ের নেতা জানিয়েছেন, বেশিরভাগ নেতাই ২০-দলীয় জোটের শরিক জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পক্ষে মত দিয়েছেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে অনেক নেতা বলেছেন, জামায়াত নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকে। বিএনপির মঙ্গল নিয়ে তারা চিন্তা করে না। মাঠ পর্যায়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গেও তাদের দূরত্ব রয়েছে। মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগী নেতা ছাড়া দলের কেন্দ্রীয় ও মাঠ পর্যায়ের বেশিরভাগ নেতাকর্মীই জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ছাড়ার পক্ষে রয়েছেন। দলের হাইকমান্ড প্রয়োজনে গোপন জরিপ চালিয়েও দেখতে পারে, তৃণমূল পর্যায়ে জামায়াতের ব্যাপারে নেতাকর্মীদের মনোভাব কী।

বিএনপির এই নেতারা আরও বলেছেন, সরকারি দল মৌলবাদী রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার ব্যাপারে দেশে ও বিদেশে ব্যাপক প্রচার চালিয়ে সফল হয়েছে। এখন জামায়াত বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকার অর্থ, তাদের সব অপকর্মের দায়ভার বিএনপির ওপরও বর্তায়। বিশেষ করে আফগানিস্তানের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে তালেবানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর এ অঞ্চলে মৌলবাদী রাজনীতির উত্থানের ব্যাপারে ক্ষমতাধর পশ্চিমা দেশগুলো এখন আরও বেশি সতর্ক। এ পরিস্থিতিতে জামায়াতের সঙ্গ দ্রুত ত্যাগ করার ঘোষণা দেওয়া উচিত। না হলে আগামী নির্বাচনের আগে সরকার দেশে-বিদেশে আরও জোরালোভাবে প্রচার করবে যে, বিএনপি ক্ষমতায় এলে দেশে মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের রাজত্ব কায়েম হবে। জামায়াত ইস্যুতে বিএনপির বিরুদ্ধে দেশি-বিদেশিদের কাছে ‘অপপ্রচার’ চালানোর সুযোগ দেওয়া আর উচিত হবে না বলে মত দেন অনেক নেতা।

সূত্র জানাচ্ছে, জাতীয় নির্বাহী কমিটির মিটিংয়ের পাশাপাশি বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও বেশিরভাগ নেতা জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ছাড়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। বৈঠকে স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদনও উপস্থাপন করেন। নেতাদের মতামত শোনার পর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করেননি। বলা হয়েছে, তাদের বক্তব্য বা অবস্থান বা প্রতিক্রিয়া পরে জানানো হবে; কিন্তু বিষয়টি এখন স্থগিত রয়েছে।

অবশ্য সঙ্গ ছাড়ার বিষয়ে বিএনপি নেতাদের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে অতীতের বিভিন্ন সময়ের মতো গতকালও একই অভিমত জানান জামায়াত নেতারা। তারা বলেন, বিএনপি জোট থেকে বাদ দিক, তারপর প্রতিক্রিয়া দেওয়া হবে।

মেহেরপুর জেলা বিএনপির সভাপতি মাসুদ অরুণ বলেন, জামায়াতে ইসলামী ইস্যুসহ অনেক বিষয়ে মাঠ পর্যায়ের নেতারা মতামত দিয়েছেন। এসব আলোচনার সমাপ্তি টানা হয়নি। দলের হাইকমান্ড সিদ্ধান্ত নেবে। তবে ওয়ান ম্যান শো পার্টির সঙ্গে ঐক্য করে লাভ নেই। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব মেনে যারা আসবেন, তাদের নিয়ে ঐক্য এবং আন্দোলন হতে পারে। মাঠের নেতারা মনে করেন, সারাদেশে ক্ষমতাসীন দলের জনপ্রিয়তা কমছে। স্ম্ফুলিঙ্গে দাবানল বিএনপিকেই জ্বালাতে হবে। তাহলে গণতান্ত্রিক আন্দোলন সফল হবে এবং খালেদা জিয়া মুক্ত হবেন।

মাঠ নেতাদের প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ বলে মনে করলেও বৈঠকে দলের হাইকমান্ড আগামীতে কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায় করে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় আসবে, এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। এদিকে দীর্ঘদিন পর বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির বৈঠকে শীর্ষ নেতৃত্বের আশাবাদী বক্তব্যে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা অনেকটা চাঙ্গা হয়ে উঠেছেন। মামলা-হামলায় জর্জরিত নেতাকর্মীদের মনোবলও কিছু বেড়েছে।

সর্বশেষ খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার আগে ২০১৮ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির বৈঠক হয়েছিল। খালেদা জিয়া কারারুদ্ধ হওয়ার পর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমান। করোনা পরিস্থিতির কারণে দলের সব রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিত ছিল। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাওয়ার পর জাতীয় নির্বাহী কমিটির নেতাদের সঙ্গে তারেক রহমানের এটি প্রথম বৈঠক। বৈঠকে নির্বাহী কমিটি ও জেলা শীর্ষ নেতাদের মনোভাব দেখে তিনি সন্তুষ্ট বলে জানা গেছে ।